১৫ ই আগস্ট: ইতিহাসের অন্ধকারতম অধ্যায়

১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবস। এই দিনে সারা বাংলার সমস্ত মানুষ, এমনকি প্রকৃতিও চোখের জল ফেলে। কারণ, ১৯৭৫ সালের আগস্টের এই দিনটিকে মনে হয়েছিল, এই বর্ষার আগষ্ট আর বঙ্গবন্ধুর নির্মম রক্তপাত যেন চরম ক্ষোভের কান্নার স্বয়ং আকাশের কান্নার প্রতিনিধি।

ভোরের ঠিক আগের মুহূর্তে বঙ্গবন্ধুর পরিবারের সবাইকে যখন খুনিরা ব্রাশ ফায়ার করছিল, তখন বৃষ্টি হচ্ছিল, প্রকৃতি যেন কাঁদছে। উত্থাপিত আগ্নেয়াস্ত্রের বিরুদ্ধে ভীতসন্ত্রস্ত বাংলাদেশ সকলেই শোকে এবং অপ্রত্যাশিত আকস্মিক ধাক্কায় স্তব্ধ। শোকের এই শিখা আগামী যুগের জন্য জ্বলবে। ১৫ই আগস্ট বিলাপ পাঠ করার দিন, স্বাধীনতার স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৪৭তম শাহাদত বার্ষিকী।।

১৫ ই আগস্ট শহীদদের তালিকা

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের সেই অন্ধকার রাতে নৃশংস ঘাতকরা সমগ্র বাঙালি জাতির নজিরবিহীন নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, বঙ্গবন্ধুর সহধর্মিণী শেখ ফজিলাতুন্নেছা, জ্যেষ্ঠ পুত্র শেখ কামাল, শেখ জামাল, কনিষ্ঠ পুত্র শেখ রাসেল, শেখ কামালের স্ত্রী সুলতানা কামালকে হত্যা করে। জামালের স্ত্রী রোজী জামাল, বঙ্গবন্ধু শেখ নাসেরের ভাই, এসবি সিদ্দিকুর রহমান, কর্নেল জামিল, সেনাসদস্য সৈয়দ মাহবুবুল হক, প্রায় একযোগে ঘাতকরা বঙ্গবন্ধুর ভাগ্নে যুবলীগ নেতা শেখ ফজলুল হক মনির বাসভবনে হামলা চালিয়ে শেখ ফজলুল হককে হত্যা করে। মনি, তার গর্ভবতী স্ত্রী আরজু মনি, বঙ্গবন্ধুর শ্যালক আব্দুর রব সেরনিয়াবাতের বাসায় হামলা চালিয়ে সেরনিয়াবাত ও তার মেয়ে বেবী, ছেলে আরিফ সেরনিয়াবাত, নাতি সুকান্ত বাবু, সেরনিয়াবাতের বড় ভাই সজিব সেরনিয়াবাতের ছেলে ও আত্মীয় বেন্টু খানকে হত্যা করে।জাতি গভীর সমবেদনা ও শ্রদ্ধায় স্মরণ করবে সকল শহীদদের।

১৫ ই আগস্ট হত্যাকাণ্ডের সাথে যারা জড়িত

1976 সালের 8ই জুন, সেই 15ই আগস্টের কথিত খুনি গ্রুপ থেকে, তাদের মধ্যে 12 জনকে বিশ্বের বিভিন্ন হাই কমিশনে চাকরি দেওয়া হয়েছিল।

  1. লেঃ কর্নেল শরিফুল হক (ডালিম)
  2. লেফটেন্যান্ট কর্নেল আজিজ পাশা
  3. লেফটেন্যান্ট কর্নেল এ কে এম মহিউদ্দিন আহমেদ
  4. মেজর বজলুল হুদা,
  5. মেজর শাহরিয়ার রশিদ,
  6. মেজর রাশেদ চৌধুরী,
  7. মেজর নূর চৌধুরী,
  8. কুয়েতে মেজর শরিফুল হোসেন
  9. কর্নেল কিসমত হাসেম
  10. লেঃ খায়রুজ্জামান
  11. লেঃ নাজমুল হোসেন
  12. লেঃ আব্দুল মাজেদ

কি হয়েছিল সেই রাতে?

১৫ আগস্টের ঘটনা বিবরণঃ ব্যক্তিগত সচিব (আবাসিক পিএ) জনাব এএফএম মহিতুল ইসলামের বক্তব্য অনুযায়ী:

১৯৭৫ সালে তিনি তৎকালীন রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বাসভবন ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের ৬৭৭ নম্বর বাড়িতে কর্মরত ছিলেন। ১৯৭৫ সালের ১৪ আগস্ট রাত ৮টা থেকে ১৫ আগস্ট সকাল ৮টা পর্যন্ত তিনি সেখানে দায়িত্ব পালন করেন। 14 আগস্ট মধ্যরাতে রাত পেরিয়ে যাওয়ার পর 15 আগস্ট সকাল 1 টায় তিনি তার নির্ধারিত বিছানায় শুতে গেছেন।

মামলার এজাহারে মহিতুল বলেন, ‘এর পর কখন ঘুমিয়ে গেছি মনে করতে পারছি না। হঠাৎ টেলিফোন মেকানিক আমাকে ঘুম থেকে তুলে বললেন, রাষ্ট্রপতি আপনাকে দেখতে চান। সময় ছিল প্রায় সাড়ে চারটা বা ভোর পাঁচটা। চারপাশে আকাশ আরও উজ্জ্বল দেখাচ্ছিল। বঙ্গবন্ধু আমাকে ফোনে বলেছিলেন, সেরনিয়াবাতের বাসায় দুর্বৃত্তরা হামলা করেছে। সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ কন্ট্রোল রুমে ফোন করি। অনেক চেষ্টা করেও পুলিশ কন্ট্রোল রুমের সাথে যোগাযোগ করতে পারিনি।

তারপর গণভবন এক্সচেঞ্জে লাইন পেতে চেষ্টা করলাম। পরে বঙ্গবন্ধু ওপরতলা থেকে এসে আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, পুলিশ কন্ট্রোল রুমে কেউ ফোন ধরছে না কেন? তখন আমি ফোনে “হ্যালো” বলে চিৎকার করছিলাম। বঙ্গবন্ধু আমার কাছ থেকে রিসিভার নিয়ে বললেন, “এই রাষ্ট্রপতি কথা বলছেন”। ঠিক তখনই একগুচ্ছ গুলি জানালা দিয়ে এসে ওই ঘরের দেয়ালে আঘাত করে। অপর একটি ফোনে প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তা মহিউদ্দিনের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করা হয়। গুলির আঘাতে ভাঙা চশমা থেকে আমার ডান হাত আহত হয় এবং রক্তক্ষরণ হয়। তারপর জানালা দিয়ে অবিরাম শুটিং শুরু হয় এবং বঙ্গবন্ধু মেঝেতে শুয়ে পড়েন। আমিও লাফ দিয়ে মেঝেতে নামলাম।

১৫ আগস্ট এর ঘটনা প্রবাহ

কিছুক্ষণ পর গুলি থেমে গেলে বঙ্গবন্ধু উঠে দাঁড়ান। আমিও উঠে দাঁড়ালাম। আবদুল নামে পরিচিত চাকর সেলিম বঙ্গবন্ধুর জন্য পাঞ্জাবি ও চশমা নিয়ে ওপরতলা থেকে এসেছেন। সেই পাঞ্জাবি চশমা পরে বঙ্গবন্ধু বারান্দায় আসেন। তিনি (বঙ্গবন্ধু) বললেন, “এত ফায়ার হচ্ছে, আপনারা সেনা সেন্ট্রি আর পুলিশ সেন্ট্রি কী করছেন? এ সময় শেখ কামাল বলেন, আমার সঙ্গে সেনাবাহিনী ও পুলিশ ভাইরা আসেন। কালো পোশাক পরা একদল লোক শেখ কামালের সামনে এসে দাঁড়ায়।

আমি (মহিতুল) এবং ডিএসপি নুরুল ইসলাম খান শেখ কামালের ঠিক পেছনে ছিলাম। নুরুল ইসলাম আমাকে পেছন থেকে ধরে তার অফিস কক্ষে নিয়ে যান। আমি সেই ঘরের বাইরে উঁকি দেওয়ার চেষ্টা করলাম। কিছুক্ষণ পর গুলির শব্দ শুনতে পেলাম। এ সময় শেখ কামাল আমার পায়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে শুয়ে পড়েন। কামাল ভাই চিৎকার করে বললেন, “আমি শেখ মুজিবের ছেলে, শেখ কামাল, ভাই বলুন”।

মহিতুল ইসলাম তার বক্তব্যে বলেন,

হামলাকারীদের মধ্যে কালো পোশাক পরা ও খাকি পোশাক ছিল। এ সময় আমরা গুলির শব্দ শুনে দেখি ডিএসপি নুরুল ইসলাম খান পায়ে গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। তখন বুঝলাম হামলাকারীরা সেনাবাহিনীর। এবং তারা খুনের জন্য এসেছিল। নুরুল ইসলাম আমাদের কক্ষ থেকে বের করে দেওয়ার চেষ্টা করলে মেজর বজলুল হুদা আমার চুল ধরে আমাকে তুলে নেন। বজলুল হুদা আমাদের নিচে নামিয়ে লাইনে দাঁড় করিয়ে দিলেন। কিছুক্ষণ পর বঙ্গবন্ধুর গলা শুনতে পেলাম।

প্রচন্ড গুলির শব্দ শোনা যায়। আমরা নারীদের হাহাকার ও পীড়িত কান্না শুনেছি। এরই মধ্যে শেখ রাসেল ও বাড়ির কাজের মেয়ে রুমাকে নিচে নিয়ে আসা হয়। রাসেল আমাকে শক্ত করে ধরে জিজ্ঞেস করল, ‘ওরা কি আমাকেও মেরে ফেলবে?’ আমি বললাম, না ওরা তোমার কিছু করবে না। আমি ভেবেছিলাম তারা এত ছোট ছেলের ক্ষতি করবে না। কিন্তু কয়েক মিনিট পর রাসেলকে তার মায়ের কাছে নিয়ে যাওয়া হবে বলে জানালে তারা তাকে একটি ঘরে নিয়ে গিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে। তখন বঙ্গবন্ধুর বাসভবনের গেটে দাঁড়িয়ে থাকা মেজর ফারুককে মেজর বজলুল হুদা বলেন, ‘সব শেষ।

অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল ফারুক রহমান তার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে বলেন,

তিনি খোন্দকার মোশতাকের নেতৃত্বে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে মিশনের সমন্বয় করেন। তিনি পুরো মিশনের দায়িত্বে ছিলেন। অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল রশিদ বঙ্গভবনের দায়িত্বে ছিলেন এবং অবসরপ্রাপ্ত মেজর ডালিম রেডিও কেন্দ্রের দায়িত্বে ছিলেন। গুরুত্বপূর্ণ স্থানে দায়িত্ব বণ্টন সবই তিনি (ফারুক) করেন।

১৫ আগস্টের বক্তব্য।  ১৫ আগস্ট এর কবিতা । ১৫ ই আগস্ট রচনা 

About adminbd

John Romeo is a content writer.

View all posts by adminbd →

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *